22 C
Bangladesh
বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৪

সড়কে মৃত্যুর মিছিল আর কতো

eaicampus.comসড়কে মৃত্যুর মিছিল আর কতো

রাইসা বাবা মার একমাত্র সন্তান। সে সপ্তাহ শ্রেণিতে পড়াশোনা করে।প্রতিদিন সে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে পড়তে যায়।একদিন সে সাইকেল চালিয়ে স্কুল শেষে বাড়ি ফিরছিলো, পিছন থেকে একটি কাভার্ড ভ্যান এসে তার সাইকেলে ধাক্কা মারে এবং সাথে সাথেই ঘটনাস্থলে রাইসার মৃত্যু হয়। আর এভাবেই রাইসার মতো অনেক শিক্ষার্থী প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াত করে।তারা আজ রাস্তাঘাটে চলাচলে কতটা নিরাপদ? আমাদের কোমলমতি শিশুরাও আজ রাস্তাঘাটে চলাচলে অনিরাপদ।

বাব-মা’রা শিশুদের একা বের হতে দিতে পারছে না।আর এমন একটা ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া। সেই কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় পিকআপ ভ্যানের চাপায় পাঁচ ভাই নিহত হয়। বাবার শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে মন্দিরে যাওয়ার পথে নয় ভাই বোনের পাঁচজনই একটি পিকআপ ভ্যানের চাপায় নিহত হন। আগে শুধু যানবাহনে-যানবাহনে দুর্ঘটনার কথা শোনা যেতে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ও পত্র-পত্রিকাতে।কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে রাস্তায় বা ফুটপাতে চলাচলরত অবস্থায় মানুষদের গাড়িতে পিষিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা শোনা যাচ্ছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু শুধু একটি পরিবারে গভীর শোক, ক্ষত সৃষ্টি করে না, আর্থিকভাবেও পঙ্গু করে ফেলে ওই পরিবারকে। কোন কোন দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি প্রাণ হারান। তখন ওই পরিবারের যে কী অবস্থা হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর যারা পঙ্গুত্ববরণ করে তাদের পরিবারের অবস্থা আরও করুণ, আরও শোচনীয়।


বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ঘরের। তারা নিজেদের পরিবারের সদস্যদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য ঘরের বাহিরে কাজের সন্ধানে বের হয়। এতে রাস্তাঘাটে চলার পথে অদক্ষ চালাকদের অসাবধানতার কারণে রারা বিভিন্ন ধরনের সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়।এতে কিছু কিছু ব্যক্তি পঙ্গুত্ব বরণ করে এবং অনেক মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে। ফলে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে সর্বোশান্ত হয়ে পড়ে।

আরো পড়ুন:  জনপ্রিয় এই ক্যাম্পাস অনলাইন প্লাটফর্মে শিক্ষার্থীদের লেখা আহ্বান


বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই) তথ্য বলেছে, গতবছর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৫ হাজার ৮৮ জনের। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৩ হাজার ৯১৮ জনের। এক বছরের ব্যবধানে মৃত্যু বেড়েছে ২৯.৮৬ শতাংশ। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য মতে,২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আট বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষ মারা গেছে এর মধ্যে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল শিক্ষার্থী। এসময় প্রতিবছরই গড়ে ৮০০ জন শিক্ষার্থী সড়কে প্রায়ান হারিয়েছে। 


গত এক দশকে দেশের সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের ৫৪ শতাংশের বয়স ১৬-৪০ বছরের মধ্যে। আর দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের সাড়ে ১৮ শতাংশ শিশু। এদের বয়স ১৫ বছরের নিচে।
দেশের কর্মক্ষম ব্যক্তিরই সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন। এর প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তি এবং তাদের উপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের আর্থসামাজিক যে ক্ষতি হচ্ছে, তার হিসেবে তৈরি লরেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট ( এআরআই)।


গত তিন বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় এমন ক্ষিতর পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা।(এআরআই) এর মতে,২০১৯ সালে দেশে মোট সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিলো ৩ হাজার ৯৩৭ টি।ওই বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৪ হাজার ৩৫৮ জন এবং আহত হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ২৪০ জন। দেশের অর্থনীতি হারিয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার ৯৬ কোটি টাকা ; যা জিডিপির ১ দশমিক ৪৮ শতাংশের সমান। 
২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিলো ৩ হাজার ৬৪টি।এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয় ৩ হাজার ৫৫৮ জন এবং আহত হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৪৫০ জন।ওই বছর সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩২ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা,যা জিডিপির ১ দশমিক ২০ শতাংশের সমান।

আরো পড়ুন:  বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অল্প বৃষ্টিতেই রাস্তায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি, নজর নেই প্রশাসনের


গত বছরে অর্থাৎ ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ২০৪ টি। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হয়েছে ৩ হাজার ৭৭৬ জনের এবং আহত হয়েছে ৪ হাজার ১০৮ জন। দুর্ঘটনায় হতাহত এবং তাদের পরিবারের আর্থসামাজিক ক্ষতি,চিকিৎসক খরচ ধরে গত বছর দুর্ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৮ হাজার ৪৪ কোটি টাকা,যা জিডিপির ১ দশমিক ৪৪ শতাংশের সমান।

 
করোনা অতিমারি সারা বিশ্বকে থামিয়ে দিতে পারলেও থামাতে পারেনি বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা; কমাতে পারেনি নিহত ও আহতের সংখ্যা। করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে ২০২১ সালে বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৮৫ দিন পরিবহণ চলাচল বন্ধ ছিল। তারপরও আগের বছরের তুলনায় নিহতের সংখ্যা বেড়েছে ১৭ শতাংশ, দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে ১৩ শতাংশ। এর জন্য সড়কপথের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৮ সালের সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় সাড়া বিশ্বে বছরে সাড়ে ১৩ লাখ মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে ৩০ শতাংশের বয়স ২৫ বছরের কম। বিশ্বে তরুণেরা যেসব কারণে বেশি হতাহত হন, এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা সবার শীর্ষে। বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর প্রাণহানি হয় ২০ হাজার মানুষের।

আরো পড়ুন:  নোবিপ্রবি এমআইএস নেটের নেতৃত্বে ওয়াজিহা—নাফিজ

 
সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে গত এক যুগে জাতীয় বাজেটে ধারাবাহিকভাবে বরাদ্দ বেড়েছ। এ সময়ে নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি পুরনো সড়কও চওড়া হয়েছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সড়ক আইন পাশ করেছে সরকার। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে,সড়কে কোনোভাবেই মৃত্যু কমছে না। গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পিছনে মোটাদাগে কয়েকটি কারণ পাওয়া যায়। এগুলো হচ্ছে,চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, অতিরিক্ত গতি,ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক।

এর বাইরে রয়েছে চালকের বেতন,কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকায় মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, বেপরোয়া মোটর সাইকেল চালানোর প্রবণতা, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিল ব্যবস্থাপনা, জনসাধারণের ওভারব্রিজ,ফুটপাত না মানা এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি। সড়কে মৃত্যুর মিছিল কমাতে হলে শুধু সরকারের একার পক্ষে দায়িত্ব নিলে হবে না।সাধারণ মানুষকেও নিজ দায়িত্বে সচেতন হতে হবে, রাস্তা পারাপারের সময় উভয় দিকে খেয়াল রাখতে হবে, অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ও যাত্রী বোঝাই যানবাহন পরিহার করতে হবে। সবাই সম্মিলিত প্রচেষ্টা থেকে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব হবে। আসুন আমরা নিজ দায়িত্বে সচেতন হয়ে নিজে সুস্থ থাকি, অন্যকে সুস্থ রাখি।

লেখকঃ প্রসেনজিৎ চন্দ্র শীল

 রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ ।

Check out our other content

Check out other tags:

Most Popular Articles