32 C
Bangladesh
বুধবার, জুলাই ১০, ২০২৪

রাবিতে কোটি টাকার সিট বাণিজ্যে অসহায় সাধারণ শিক্ষার্থী

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়রাবিতে কোটি টাকার সিট বাণিজ্যে অসহায় সাধারণ শিক্ষার্থী

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে কোটি টাকার সিট বাণিজ্যের অভিযোগ বেশ পুরোনো। এই সিট বাণিজ্যের ভুক্তভোগী হাজার হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী। এমন গুরুতর অভিযোগ সত্ত্বেও দেখার কেউ নেই এমনকি প্রশাসনও এই বিষয়ে নীরব। চলমান সিট বাণিজ্য নিয়ে কেউ কেউ মুখ খুলেছে আবার অনেকে মুখ খুলতে সাহসই পায়নি। অভিযোগ আছে, যারা সিট বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছে তাদের হল থেকেই নামিয়ে দিয়েছে ছাত্রলীগের কিছু অসৎ নেতাকর্মীরা। এতকিছুর পরও মাঝে মধ্যেই এই সকল ভয়ভীতি উপেক্ষা করে সিট বাণিজ্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে দেখা যায় কিছু কিছু শিক্ষার্থীকে। তাদের মধ্যেই একজন হলেন ফিন্যান্স বিভাগের ২০১৬-১৭ সেশনের শিক্ষার্থী মিয়া মুহাম্মদ সুজন। সুজন নামের এই শিক্ষার্থী এই সিট বাণিজ্যের কড়ালগ্রাসে তার আত্নবেদনা ও মনকষ্টের কথা তুলে ধরেন ফেসবুকে। আক্ষেপ নিয়ে ঐ শিক্ষার্থী লিখেন,

“একদিন কিংবা একরাতও আবাসিক হলে না থেকে ৩২ মাসের ৩২০০ টাকা ভাড়া প্রদানে বাধ্যকৃত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হলের একজন গর্বিত আবা-অনাবাসিক শিক্ষার্থী বলছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানের কথা চিন্তা করে এতদিন চুপ ছিলাম। তবে আর নয়, অনেক হয়েছে। নিম্নমধ্যবিত্ত বাবার রক্ত হীম করা টাকা ভাড়া দিয়ে, নিজে পদে পদে কিছু শিক্ষিত মানুষের দ্বারা অপমানিত হওয়া সত্বেও ভার্সিটির সম্মান বাঁচানোর দায় অন্তত আমার না।”

ঐ শিক্ষার্থী ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে সৈয়দ আমীর আলী হলে সিট বরাদ্দ পেলেও আজ ২০২২ সালে এসেও আবাসিক হলের সিটে উঠতে পারেননি। তিনি আক্ষেপ করে অদ্যাবধি হলের সিটে উঠতে না পারার কারন  হিসেবে লিখেন, “প্রচলিত রাজনীতি না করা, সিট বাণিজ্যে অংশগ্রহণ না করা হল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরিচিত কিংবা প্রিয়জন না হওয়া, আবাসিক হলে পরিচিত ভাই-ব্রাদার না থাকা কিংবা থাকলেও রাজনৈতিক ব্যাকাপ না থাকা ইত্যাদি ইত্যাদি।”

সৈয়দ আমীর আলী হলের তৎকালীন প্রভোস্ট পর্যন্ত তার এই সমস্যার কোনো সমাধান করে দেননি। এছাড়া তার ডিপার্টমেন্টের বড় ভাইও রাজনৈতিক তার সাথে আচরণই করেছেন। এমনটিই অভিযোগ করেছেন ঐ শিক্ষার্থী। এই সম্পর্কে তিনি বলেন, “তখন বরাদ্দকৃত সিটের ব্যাপারে জানতে চাইলে তৎকালীন প্রোভোস্ট স্যার বলতেন, ‘তোমাকে তোমার বড় ভাই হলে তুলবে।’ আর বড় ভাইয়ের সাথে দেখা করলে তিনি বলতেন, ‘তোমাকে স্যার হলে তুলবে।’ দুজনে ফুটবলের মতো আমাকে নিয়ে পাস পাস খেলছিলো। বার বার দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছেন, গরু ছাগলের মতো ব্যবহার করেছেন। স্যারকে কিছু বলবো, সেই সুযোগটা পর্যন্ত তিনি আমাকে দেননি।”

এই হলের বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে উল্টো তাকে হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে। বৈধভাবে সিট বরাদ্দ পেলেও একদিনের জন্যও সৈয়দ আমীর আলী হলে উঠতে পারেনি ঐ শিক্ষার্থী। অথচ তাকে বলা হচ্ছে, ৩২ মাসের হল ভাড়া পরিশোধ করতে। হলের ভাড়া পরিশোধ না করলে তার চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার জন্য ফর্ম ফিলাপ করতে দেওয়া হবে না। আর অন্যদিকে তার সার্টিফিকেটও আটকে দেওয়া হবে বলে জানায় হল প্রশাসন।

আরো পড়ুন:  রাবিতে ২য় সিলেকশনের ফল প্রকাশ করেছে, আবেদন ২৫ জুন পর্যন্ত 

ঐ শিক্ষার্থী আরও প্রশ্ন তোলেন, হলে আবাসিকতা প্রদানের সাথে জড়িত দায়িত্বশীল ও তাদের দায়িত্ব নিয়ে। তিনি বলেন, “আমার প্রশ্ন হচ্ছে, একজন শিক্ষার্থীকে আবাসিক হলের সিট বরাদ্দ দিবে কে? সিট বরাদ্দ দেয়ার পর তাকে সিটে তোলার দায়িত্ব কার? আবাসিক হলের সিট প্রদানের ক্ষেত্রে কী বিবেচনা করা হয়? লবিং না অসহায় ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীর প্রয়োজন? একটি স্বায়ত্তশাসিত স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিকতা প্রদানের কোনো সিস্টেম কি এমন হতে পারে? এই সকল অনিয়ম নিয়ে কথা বলা, প্রতিবাদ করা ও জবাবদিহি করার কি কেউ নেই? এভাবে কি একটি বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে?”

ঐ শিক্ষার্থীর ৩২ মাসের ভাড়ার মধ্যে ১০ মাসের ভাড়া এমন রয়েছে যার কোন হদিস কারও জানা নেই। এই ভাড়াকে ঐ শিক্ষার্থী ভূতুরে ভাড়া বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি বলেন, “শুধু তাই নয়, এই ৩২ মাসের ভাড়ার মধ্যে ১০ মাসের ভাড়া (২০১৮-এর অক্টোবর পর্যন্ত) আমার নয়। এই অতিরিক্ত ১০ মাসের ভাড়া যে আদতে কার সেটাও এক রহস্যময় ব্যাপার।”

ঐ শিক্ষার্থী নিজের আর্থিক অসহায়ত্বের কথা উল্লেখ সাপেক্ষে একদিনও আবাসিক হলে না থেকে কেন ৩২ মাস এবং ১০ মাসের ভূতুরে ভাড়া দিবেন তা নিয়ে জোরালোভাবে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, “আজ এই কঠিন সময় দাঁড়িয়ে আবাসিক হলের সিটে একদিনও না থেকে কেন আমাকে ৩২ মাসের ভাড়া দিতে হবে? আমার স্থলে যে ছিলো সে কী তার ভাড়া পরিশোধ করেনি? যদি না দিয়ে থাকে সেখান থেকে ভাড়া আদায় করার দায়িত্ব কার? সেই সামর্থ কি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নেই? কার না কার অতিরিক্ত ১০ মাসের ভূতুরে ভাড়া কেন আমাকে দিতে হবে?”

  বর্তমানে ঐ শিক্ষার্থী চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত আছেন। চতুর্থ বর্ষে ভর্তি এবং পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপের সুযোগ নিয়ে তাকে জিম্মি করে ভাড়া আদায়ের বিষয়ে ঐ শিক্ষার্থী বলেন, “সেই ২০১৮ সালে আবাসিক হলে ভর্তি হয়েও উঠতে পারিনি বলে বর্তমানে ফর্ম ফিলাপের জন্য আমাকে এক প্রকার জিম্মি করে ৩২ মাসের ভাড়া দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।”

তিনি এই সিট বাণিজ্যের সাথে জড়িত নির্দিষ্ট কোনো সংগঠনের নাম না বললেও এই সংগঠন যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চেয়েও কতটা শক্তিশালী তা তার জমে থাকা ক্ষোভ থেকে স্পষ্ট প্রকাশ পায়। তিনি বলেন, ”বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগঠন যদি বড় হয়ে যায়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে সেই সংগঠনটির পরিচিত হওয়ার কী প্রয়োজন? সেই সংগঠনের নামে বিশ্ববিদ্যালয় নিজে পরিচিত হলেই পারে। প্রশাসনিক দায়িত্ব যদি সংগঠনই পালন করবে তবে প্রশাসনের কী প্রয়োজন? সকল প্রকার প্রশাসনিক দায়িত্ব সংগঠনকে দিয়ে প্রশাসন সম্পূর্ণ রিলেক্স হয়ে গেলেই হয়। আর প্রশাসনিক পদে থাকা বিশেষ করে, হল প্রশাসনের পদধারীদের যেহেতু কোনো কাজই থাকে না সেহেতু তাদের সেখানে থাকারই বা কী প্রয়োজন? কাগজপত্রের সাইন করার মতো বিষয়গুলোও না হয় সংগঠন দেখবে। তাহলে অন্তত বিষয়টা দ্বিপাক্ষিক জটিলতা থেকে কমে একপাক্ষিক হবে। সেটাই ভালো নয় কি?”

আরো পড়ুন:  উদ্বোধন হলো "অমর একুশে গ্রন্থ কুটির-২০২৩"

এই সিট বাণিজ্যের সাথে জড়িত সংগঠন ও তার নেতাকর্মীদের ঐ শিক্ষার্থী জোঁকের সাথে তুলনা করেন। তিনি বলেন, “বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে কতিপয় জোঁকেদের বসবাস। যাদের বাইকের তেলে নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত বাবাদের ঘামের গন্ধ মিশে থাকে। এই জোঁক শ্রেণী সহজসরল বাবাদের রক্ত চুষে খাওয়া রক্তখেকো।”

এই সংগঠন এবং তার নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার পরিণতি সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, “এই সমাজে এই কতিপয় জোঁকেদের নাম নেয়া যায় না। বাস্তবে জোঁকের হাড়গোড় থাকে না, অথচ এই সকল কতিপয় জোঁকের নামে অভিযোগ করলে অভিযোগকারীরই হাড়গোড় থাকে না। হয়তো আমার সাথেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। যদি এরকম কিছু ঘটে তবে সেটা কে বা কারা ঘটাতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।”

এই সমস্যার সম্মুখীন যে তিনি একাই হয়েছেন এমনটাও নয়। অগণিত শিক্ষার্থী একই সমস্যার শিকার হয়ে দিনাতিপাত করছেন। সুজন নামের শিক্ষার্থীর সেই আক্ষেপের পোস্টে অনেকেই তাদের অসহায় অবস্থার কথা ব্যক্ত করেন। Md Akhlakuzzaman Hiron নামের এক শিক্ষার্থী মন্তব্য করেন ,“আমি ২৬ মাসের ভাড়া বহন করছি। এখনো সিট পাইনি।”

Md. Shariful Islam নামের অন্য এক শিক্ষার্থী মন্তব্য করেন, “আবাসিকতা সিস্টেমের পরিবর্তন দরকার। আমি চার বছরে ৪৮০০ টাকা দিয়েছি।অথচ সিটে উঠতে পারি নি।শেষে সিট বাতিল করে দিয়েছি।” Md Osman Goni নামের আরও এক শিক্ষার্থী বলেন, “৮ মাস থেকে ভাড়া দিয়ে আসছি।”

এই সকল ঘটনা থেকে শত শত সাধারণ শিক্ষার্থীর অসহায়ত্ব প্রকাশ পায়। তাছাড়া ভয় ও আতংকে কেউ এই ধরণের তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হলেও তা প্রকাশ করে না। সংগঠনটির ক্ষমতা বোঝাতে শেষ একজনের মন্তব্য তুলে ধরা যেতে পারে। Md. Aowal Hossain নামের একজন ব্যক্তি বলেন, “যখন একটা হলের প্রাধ্যক্ষ বলে আমি কিভাবে সীট দিবো ছাত্রলীগের ওমকের কাছে যাও তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আর শিক্ষক হিসাবে সম্মান পাওয়ার যোগ্য নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয় রাখা এখন সময়ের দাবী।”

আরো পড়ুন:  আজ থেকে রাবির হল খোলা, কি বলছে শিক্ষার্থীরা?

আবাসিক হলের আবাসিকতা প্রদান সংক্রান্ত চলমান সিস্টেম ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনটির কার্যক্রম সম্পর্কে Hasanuzzaman Hasan নামের একজন মন্তব্য করেন, “এখনি যে অবস্থা, ছাত্রলীগ রুমে রুমে এতে রাত-বিরাতে নাম, সেশন, বিভাগ ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে, তাতে মনে হয়না আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বৈধতার সাথে হলে সিট পাবে। ধিক এই সিস্টেমের।”

সৈয়দ আমীর আলী হলের বর্তমান প্রভোস্ট ড. মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল মামুন। সুজন নামের ঐ শিক্ষার্থীর ৩২ মাসের ভাড়া সম্পর্কিত বিষয়টি নিয়ে বর্তমান প্রভোস্টের সাথে যোগাযোগ করা হলে ‘এই ক্যাম্পাস’ প্রতিনিধির প্রশ্নের জবাবে তিনি যা বলেন,

রাবি প্রতিনিধি: ঐ শিক্ষার্থী তো একদিনও হলে থাকেনি। তাহলে তাকে কেনো ৩২ মাসের ভাড়া দিতে হবে?

প্রভোস্ট: আমি ২০২০ সালের জুলাই মাসের ১ তারিখে প্রভোস্ট হিসেবে জয়েন করেছি। আর ঐ শিক্ষার্থী আবাসিক হয়েছে ২০১৮ সাল থেকে। তাই আগের প্রভোস্ট কি করেছে সেটা আমি জানি না।

রাবি প্রতিনিধি: একজন শিক্ষার্থী বৈধভাবে আবাসিকতা পেলে তাকে হলে উঠানোর দায়িত্ব কার?

প্রভোস্ট: অবশ্যই হল প্রশাসনের।

রাবি প্রতিনিধি: এরকম অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা আবাসিক হয়েও হলে উঠতে পারেনি, প্রশ্ন হচ্ছে, কেনো তারা এখনো হলে উঠতে পারছে না?

প্রভোস্ট: আমার হলে এরকম নেই। যাদের আবাসিকতা আছে তাদের ম্যাক্সিমামকেই আমি হলে তুলে দিয়েছি। গতমাসেই আমি এলট দিয়ে ৮৫ জনকে তুলে দিয়েছি। হয়তো হাতেগোনা ৫/৬ জন বাদ থাকতে পারে। আর আবাসিক সবাইকেই হলে তুলে দেওয়া হয়েছে।

রাবি প্রতিনিধি: সুজন নামের ঐ শিক্ষার্থী বিষয়ে এখন কি পদক্ষেপ নিবেন?

প্রভোস্ট: আমি তাকে বলেছি, ঈদের পরেই আমি তাকে হলে তুলে দিবো। তার আগ্রহ থাকলে আমি ঈদের পরেই আমি নিজে দায়িত্ব নিয়ে তাকে হলে তুলে দিবো।

একটি দেশের স্বনামধন্য ও স্বায়ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান সিট বাণিজ্য এবং আবাসিকতা প্রদান ও ভাড়া ধার্যকরণ পদ্ধতিসহ যাবতীয় সকল অনিয়ম সম্পর্কে জানতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ছাত্র-উপদেষ্টার (জনাব তারেক নূর মামুন) সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বার বার চেষ্টা করেও তাকে ফোনে পাওয়া না যাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

Check out our other content

Check out other tags:

Most Popular Articles